গত বছর বিশ্বজুড়ে মোট ৬৯২ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে খাতটিতে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (ইরেনা) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা ও জলবায়ু সংকট মোকাবেলার চাপ বাড়তে থাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ জোরদার হয়েছে। খবর ন্যাশনাল নিউজ।
আবুধাবিভিত্তিক সংস্থা ইরেনা জানিয়েছে, নতুন করে ৬৯২ গিগাওয়াট যুক্ত হওয়ায় বিশ্বের মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৪৯ গিগাওয়াটে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রবৃদ্ধির সিংহভাগই এসেছে সৌরশক্তি থেকে। গত বছর এ খাতে মোট ৫১১ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে, যা মোট প্রবৃদ্ধির প্রায় ৭৫ শতাংশ। সৌরশক্তির পরেই রয়েছে বায়ুশক্তি, যা থেকে এসেছে ১৫৯ গিগাওয়াট। সম্মিলিতভাবে সৌর ও বায়ুশক্তি গত বছরের নিট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা বৃদ্ধির ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশ দখল করে রেখেছে।
ইরেনার মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উৎপাদন খরচ নাটকীয়ভাবে কমা এ প্রবৃদ্ধির মূল কারণ। গত বছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতায় সর্বকালের সেরা অগ্রগতি দেখিয়েছে। এ অঞ্চলে এক বছরে সক্ষমতা বেড়েছে ১২ দশমিক ৭ গিগাওয়াট, যা ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতায় নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। দেশটি এক বছরে ৫ দশমিক ৭ গিগাওয়াটের বেশি নবায়নযোগ্য সক্ষমতা যুক্ত করেছে, যা পূর্ববর্তী সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৮৭ শতাংশ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও অস্থিরতা দেশগুলোকে নিজেদের জ্বালানিনীতি নিয়ে পুনরায় ভাবতে বাধ্য করছে। জীবাশ্ম জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার ও মূল্যের অস্থিতিশীলতা থেকে বাঁচতে বিভিন্ন দেশ এখন দেশীয় ও নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে ঝুঁকছে।
আঞ্চলিক সক্ষমতার বিচারে বর্তমানে শীর্ষস্থানে রয়েছে এশিয়া। গত বছর শেষে মহাদেশটির মোট নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৯১ গিগাওয়াটে। এরপর ৯৩৪ গিগাওয়াট সক্ষমতা নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইউরোপ। বিপরীতে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল, যেখানে মোট সক্ষমতা ২১ দশমিক ৩ গিগাওয়াট।
তবে প্রবৃদ্ধির মাঝেও ভৌগোলিক বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইরেনা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর যুক্ত হওয়া নতুন সক্ষমতার প্রায় ৮০ শতাংশ বা ৫৫০ গিগাওয়াট এসেছে মাত্র তিনটি অঞ্চল থেকে, যথা চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও যুক্তরাষ্ট্র। অনেক উন্নয়নশীল দেশ এ দৌড়ে এখনো পিছিয়ে রয়েছে, যা ২০২৪ সালেও লক্ষ করা গেছে।
ইরেনার মহাপরিচালক ফ্রান্সিসকো লা ক্যামেরা জানান, অনিশ্চয়তার এ সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সবচেয়ে স্থিতিশীল বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জ্বালানি রূপান্তরের জন্য বিনিয়োগ করা দেশগুলো বর্তমান বৈশ্বিক সংকট তুলনামূলক কম অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে মোকাবেলা করতে পারছে।
তার মতে, জ্বালানি উৎপাদন যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট উৎস বা বড় কোনো কোম্পানির ওপর নির্ভর না করে অনেক ছোট ছোট উৎস থেকে আসে, তখন সেটি যেকোনো দুর্যোগ বা সংকটে অনেক বেশি টেকসই হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেহেতু স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব এবং এর খরচও কম, তাই এটি আমদানীকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছিল, ফলে সে বছর এ খাতে যুক্ত হয় ৫৮২ গিগাওয়াট সক্ষমতা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে ও কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনতে দেশগুলো এখন খাতটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রবৃদ্ধির এ হার আরো ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্সিসকো লা ক্যামেরা। তিনি উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরো ছড়িয়ে দেয়ার গতি বর্তমানের তুলনায় বহুগুণ বাড়াতে হবে।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ) জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে। গত বছরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা ৫০ শতাংশ বেড়ে ৫১০ গিগাওয়াটে উন্নীত হয়।
উল্লেখ্য, ওই বছর নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল চীন।